অভিনেত্রীদের চরিত্র নিয়ে কটাক্ষ আসলে কদর্য মানসিকতা

গৌতম সরকার

আচ্ছা বলুন তো, আমার-আপনার ঘরের মেয়ে যদি সিনেমা বা টেলি সিরিয়ালের অভিনেত্রী হয়, তাহলে কি আমরা তাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলি? নাকি এই বিশেষ ক্ষেত্রে ছাপ ফেলার জন্য তাদের উৎসাহিত করি? নিশ্চয়ই ওদের কাজ আমাদের গর্বিত করে। ধান ভানতে এই শিবের গীত গাওয়ার কারণ এবার সরাসরিই বলি। দু’জন নায়িকা এবার লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন এই বাংলায়। তৃণমূল প্রার্থী তাঁরা। মিমি চক্রবর্তী ও নুসরত জাহান। প্রথম জন কার্যত উত্তরবঙ্গের ঘরের মেয়ে। জলপাইগুড়ির কন্যা তিনি। রক্ষণশীল সংখ্যালঘু সমাজে নূসরত এক আশ্চর্য ব্যাতিক্রম। না, তাঁদের প্রশংসা বা সুখ্যাতি করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তাঁদের রাজনীতিকে সমর্থন করাও লক্ষ্য নয়।

Top News

এমন নয় যে এই প্রথম বাংলায় সিনেমা তারকারা প্রার্থী হয়েছেন। জর্জ বেকার হয়েছেন, নিমু ভৌমিক হয়েছেন, জয় বন্দ্যোপাধ্যায় হয়েছেন। জিতে বিধায়ক হয়েছেন নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবশ্রী রায়। লোকসভাতে গিয়েছেন দেব, শতাব্দী রায়, সন্ধ্যা রায়রা। মিমি ও নূসরত হাল আমলের নায়িকা। তাঁরা প্রার্থী হতেই গেল গেল প্রচার শুরু হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের নিয়ে ঠাট্টাতামাশা শালীনতার সীমা ছাড়াচ্ছে। কিছু রাজনৈতিক নেতা সেই অশালীনতাকে প্রশ্রয়ও দিচ্ছেন। ব্যাপারটা সুস্থ চেতনার মানুষের সীমা ছাড়াচ্ছে। সিনেমার প্রয়োজনে নায়িকাদের যে পোশাক পরতে হয়, তার ছবি পোস্ট করে বা তার উল্লেখ করে যেভাবে মিমি, নূসরতকে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাতে শুধু ওঁদের নয়, সাধারণ ভাবে মহিলা সমাজের মর্যাদাহানি হচ্ছে।পেশা একটি মানুষের জীবিকা। শিক্ষক যেমন প্রার্থী হতে পারেন, আইনজীবী যেমন পারেন, তেমনই অভিনয় জগতের মানুষদের ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় কোন বাধা নেই। এটাই গণতন্ত্র। তাতে যৌনকর্মীও যদি কোনদিন ভোটে দাঁড়ান, তাতে আপত্তি তোলার কারণ থাকতে পারে না। আর মিমি, নূসরত তো বিনোদন জগতে তারকা। তাহলে তো টেলি তারকা স্মৃতি ইরানি, ড্রিমগার্ল বলে পরিচিত হেমামালিনী কিংবা অতীতের রেখা কিংবা রূপা গঙ্গোপাধ্যায়দের সাংসদ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হয়। এঁদের সঙ্গে মিমি, নূসরতের পার্থক্য কী? বয়সের ফারাক। একজন রাজনৈতিক নেতাকে বলতে শুনলাম, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় তো জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। তা মিমিও তো পেয়েছেন। বয়সের ফারাক ছাড়া তাঁরা কম কীসে? তাঁরা যদি সংসদে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেন, তাহলে আপত্তি কেন?

অভিজ্ঞতা নেই? প্রথমেই অভিজ্ঞতা নিয়ে কি সবাই জনপ্রতিনিধি হন? রাজনীতির কিংবা প্রশাসনের কোন অভিজ্ঞতা নিয়ে গায়ক বাবুল সুপ্রিয় প্রথমে সাংসদ, পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন? কাজের মধ্যে দিয়ে সবাই শিখে নেন। আসলে মিমি, নূসরত কে এভাবে হেনস্থা করার পিছনে আছে পুরুষতান্ত্রিক একরকম কদর্য মানসিকতা। যেখানে অভিনেত্রীদের সবসময় বাঁকা চোখে দেখা হয়। তাঁদের উদ্দেশে কুরুচিকর মন্তব্য করে পুরুষতান্ত্রিক একরকম বিকৃতিকে চরিতার্থ করা হয়। সর্বোপরি, মহিলাদের পণ্য মনে করার ভাবনার প্রতিফলন এই অশালীনতায়। কেউ যদি রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বা লকেট চট্টোপাধ্যায় বা শাবানা আজমি নামে এমন কুরুচিপুর্ণ কথা বলেন, তারও প্রতিবাদ করা উচিত।

দুর্ভাগ্যজনক হল, মিমি, নূসরতের প্রতি এমন হেনস্থায় সমাজের সর্বস্তরে তেমন প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি, মহিলা সংগঠনগুলিও নীরব। এই ধরনের মানসিকতাকে ধিক্কার না জানিয়ে পারছি না।