দেশ থেকে বিদেশ সবার প্রিয় ‘সুষমাজি’

ওয়েব ডেস্ক, ৭ আগস্টঃ বিদেশ মন্ত্রকের মতো গুরুদায়িত্ব সামলানোর সঙ্গে সঙ্গে জনসংযোগ, সঙ্গে পরিবার, কোনও কিছুতেই খামতি ছিল না তার। দেশের কেউ অসুবিধার কথা জানালে সঙ্গে সঙ্গেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। শুধু দেশ নয় বিদেশী নাগরিকদের সাহায্যেও দ্রুত এগিয়ে গিয়েছেন তিনি। তাই তো তিনি সবার প্রিয় ‘সুষমাজি’।

Top News

১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে হরিয়ানার আম্বালা ক্যান্টনমেন্টে হারেদে শর্মা ও শ্রীমতী লক্ষ্মী দেবীর সন্তান হিসাবে জন্মগ্রহণ করেন সুষমা শর্মা। তার বাবা ছিলেন একজন বিশিষ্ট রাষ্ট্রীয় স্বায়ত্ত্বক সংঘের সদস্য। তার বাবা-মা পাকিস্তানের লাহোর শহরের ধরামপুরা এলাকা থেকে এসেছিলেন। ছোট থেকে পড়াশোনার প্রতি আকর্ষণ ছিল সুষমার৷ সংস্কৃত এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হন তিনি৷ এরপর ভাবেন আইন নিয়ে পড়বেন৷ চণ্ডীগড়ের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। সেখানেই সহপাঠী হিসাবে পান স্বরাজ কৌশলকে৷ এক সময় ভাল বন্ধু হয়ে ওঠে স্বরাজ ও সুষমা। কিন্তু ‘বন্ধু’র গণ্ডিতে না থেকে কলেজ জীবন থেকেই একে অপরের সঙ্গে পথচলার অঙ্গীকার করে ফেলেন স্বরাজ-সুষমা৷ কিন্তু সম্পর্ক মেনে নেয়নি তাদের পরিবার। কিন্তু তাতে কি, তারা তো একে অপরের সঙ্গে পথচলার অঙ্গীকার করেই ফেলেছে। তাই তো পরিবারের অমতে ১৯৭৫ সালের ১৩ জুলাই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় সুষমা। সুষমা তাঁর নামের শেষে বসিয়ে দিলেন ‘স্বরাজ’। হয়ে গেলেন সুষমা স্বরাজ। সেই সময় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ছিলেন সুষমা৷

আইনজীবী থেকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন সুষমা৷ বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা নেতা লালকৃষ্ণ আডবানির হাত ধরে রাজনীতির কৌশল রপ্ত করেছিলেন তিনি। বাজপেয়ী জমানায় বিজেপি শিবিরে অন্যতম ভরসা ছিলেন সুষমা। হয়ে উঠেছেন প্রকৃত জননেত্রী৷ মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে হরিয়ানা মন্ত্রিসভায় জায়গা পান কণিষ্ঠতমা সদস্যা হিসেবে। এরপর শুধুই উত্থানের কাহিনি। সাতবার লাগাতার নির্বাচিত হয়েছিলেন লোকসভার সাংসদ হিসেবে। বিগত লোকসভা নির্বাচনে নিজেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাননি। ২০১৪-১৯, মোদী-জমানার প্রথম পর্বে সুষমা ছিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। ইন্দিরা গান্ধীর পর তিনিই দ্বিতীয় মহিলা, যিনি দেশের বিদেশ মন্ত্রকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। প্রথম মোদী সরকারে বিদেশমন্ত্রী হিসেবে প্রশ্নাতীত জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছিলেন সুষমা। পাসপোর্ট থেকে ভিসা সমস্যা? বা যেকোনো সমস্যা দেশের মানুষ নির্দ্বিধায় টুইট করেছেন তাঁদের প্রিয় নেত্রীকে। আর তাঁদের কাউকেই নিরাশ করেননি ভারতের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী। শুধু দেশের মানুষ নয়, সুষমা স্বরাজ নিরাশ করেননি এদেশে ঘুরতে আসা ভিনদেশিদেরকেও। দেশের মানুষের সাহায্যার্থে সর্বদা সজাগ দৃষ্টি ছিল তাঁর। দেশের সুনাম রক্ষায় তিনি যেন ছিলেন এক অতন্দ্র প্রহরী।

গীতা নামের সেই মূক ও বধির মেয়েটিকে মনে আছে তো? লাহোর রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা সমঝোতা এক্সপ্রেস থেকে বছর এগারোর একটি ছোট্ট মেয়েকে উদ্ধার করে পাকিস্তান রেঞ্জার্স। সে সময় মূক ও বধির এই শিশুর বাড়ির ঠিকানা জেনে ওঠা সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানের করাচির একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাছে আশ্রয় পায় সে। সেখানেই বেড়ে ওঠে সে। এ সময় মেয়েটির থেকে ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা জানতে পারে যে, তার বাড়ি ভারতে। দীর্ঘ ১১ বছর পর তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের তত্পরতায় ২৬ অক্টোবর ২০১৫-এ দেশে ফিরে আসে গীতা। দেশে ফেরার পর থেকে ইনদওরের মূক বধির সংগঠনের আশ্রয়েই রয়েছেন গীতা। তাকে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে সব রকম চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সুষমা স্বরাজের একটি টুইট সামনে আসে। সেই টুইটে গীতার পরিবারের কেউ হদিশ দিতে পারলে ১ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়।

তবে এখনও মেলেনি গীতার পরিবারের খোঁজ। এখনও ইনদওরের মূক বধির সংগঠনেই রয়েছেন গীতা। কিন্তু গীতার পাশে আর নেই সেই মানুষটা, যিনি গীতাকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সুষমার প্রয়াণে ইশারায় তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন গীতা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন ঘোরাফেরা করছে সেই ভিডিয়ো।

শুধু কি তাই ২০১৭ অক্টোবরে ভারত-পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ যখন চরমে, সেই পরিস্থিতিতেও মানবিকতাকেই সবার উপরে স্থান দিয়েছিলেন সুষমা স্বরাজ। লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য দুই পাকিস্তানি নাগরিককে অবিলম্বে ভিসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন তিনি। উদারতা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মন জিতে নিয়েছিলেন পাকবাসীর কাছেও।

বিদেশমন্ত্রী থাকাকালীন সুষমা স্বরাজই প্রথম বুঝিয়ে ছিলেন, টুইটারকে হাতিয়ার করে কীভাবে দূর দেশের অসহায় মানুষদের কাছে এক মুহূর্তে পৌঁছে যেতে হয়। চলে গিয়েছেন তিনি। তবে পড়ে রয়েছে তাঁর সেই টুইটগুলি। সুষমা স্বরাজের টুইট পেজ খুললে সব থেকে বেশি চোখে পড়তো আর্ত পাকিস্তানিদের অনুরোধ-আবেদন। কেউ কেউ বলতেন, চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে চাই। কেউবা আবার বলতেন, বৈবাহিক সম্পর্ক প্রশ্নের মুখে। স্ত্রীর কাছে আসতে পারছি না। আমার জীবন বাঁচান। দয়া করে ভিসা দিন। নিরাশ করেননি প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী। ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেই পাকিস্তানি নাগরিকদের ভিসার ব্যবস্থা করতেন সুষমা। তাই তো তার অকাল প্রায়ানে চোখের জল পড়েছে পাকিস্তানেরও। পাক ক্রিকেট সাংবাদিক আলিয়া রশিদ যেমন শোকপ্রকাশ করে বলেছেন, পাকিস্তানি রোগীদের জন্য সবসময় ভাবতেন সুষমা।

মৃত্যুর ঠিক ঘন্টা পাঁচেক আগেই কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল নিয়ে শেষ টুইট করেন সুষমা। সেই টুইটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে সুষমা লিখেছিলেন, “অনেক অনেক ধন্যবাদ। হৃদয় থেকে অভিনন্দন। সারা জীবন ধরে এইদিনটা দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলাম”।