বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙিয়া বাঙালির শৈশব চেতনাকে আঘাত করিল রাজনীতির সন্ত্রাসীরা

কল্যাণময় দাসঃ অবিশ্বাস্য এক প্রতিকূল রাজনৈতিক অগ্নিচক্রের বলয়ে আমরা নিক্ষিপ্ত হইয়াছি। আমি ইহাকে Mainstream political Terrorism বলিয়া আখ্যায়িত করিতে চাহি। ইহার ছোবল হইতে আমাদের বর্ণপরিচয় যিনি দিয়াছেন গতকল্য সেই সমাজসংস্কারক মহান মানুষকেও বাদ রাখা হইল না।

Top News

সংস্কৃত ভাষা সাহিত্যের ভান্ডার আর ইংরাজি ল্যাঙ্গুয়েজ য়্যান্ড লিটারেচার ছেঁকিয়া যিনি আমাদের বাঙ্গালা ভাষার একটা দিগদর্শন করাইয়াছিলেন, যিনি বাল্যবিবাহ রোধ করিয়াছিলেন, যিনি বিধবাবিবাহ আইন করিবার জন্য বিপ্লব করিয়াছিলেন, বাংলার সমাজের অন্ধত্ব, কুসংস্কার এবং গোঁড়ামির বিপরীতে ঋজু গ্রীবা লইয়া দাঁড়াইয়া আস্হাহীন মানুষকে শুনাইয়াছিলেন গভীর আস্হার শ্লোক – সেই বিদ্যাসাগরও  political terrorist দিগের ছোবল হইতে বাদ রহিলেন না।

চৈতণ্য, লালন, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ আমাদের। বীর নেতাজী আমাদিগের, হারাইয়া যাওয়া নেতাজীও আমাদিগের। এই মহামানবদের মুছিয়া ফেলিবার চক্রান্তকারীদের মেইনস্ট্রিম পলিটিক্যাল টেররিস্ট আখ্যায়িত করিলে খুব কি ভুল বলা হইবে?

রাশিয়ায় লেনিনমূর্তি ভাঙ্গা, বামিয়ানে হাজার বছরের বুদ্ধমূর্তি ভাঙ্গা, ত্রিপুরায় সুকান্তমূর্তি উৎপাটন, আমেরিকায় WTC গুঁড়াইয়া দেওয়া, অজস্র হত্যালীলা সংঘটিত করা যাহাদিগের কাজ, তাহাদিগের একটা স্বচ্ছ ভাবমূর্তি আছে যে উহারা সকলেই পৃথিবীর মনুষ্যকুলের চক্ষে টেররিস্ট। উহারা সন্ত্রাসবাদী বলিয়াই আখ্যায়িত। কিন্তু আপনাদিগের পরিচয় কি হইবে ?

রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভ ও লালসায় আপনাদিগের জিহ্বা মহামানবদিগকেও রেহাই দিতেছে না। ইহা কোন আদর্শে প্রতিপালিত হইতেছে ?

ভারতবর্ষের ও বাঙ্গালীর  শিক্ষা-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য-নব্য সৃজন, সব তছনছ করিবার হিংস্র, ভারসাম্যহীন ভন্ডামি চলিতেছে আজিকার দেশ জুড়িয়া।

আজ সমগ্র ভারত জুড়িয়া Terrorist-এর political war চলিতেছে। ইহার চক্রব্যুহে আমরা সাধারণ মানুষ তো বটেই মহামানব ঋষি সমাজসংস্কারকদেরও বাদ রাখা হইতেছে না। যে মানুষটার সাথে বাঙ্গালীর সেই শৈশবের হাতেখড়ির যোগ, যেই মানুষটার মাতৃভক্তির গল্প শুনিয়া চক্ষে জল আসিত, যে মানুষটা পিতার সহিত পথ চলিতে চলিতে মাইলফলক দেখিয়া দেখিয়া গণিতের প্রথমপাঠ শিখিয়া লইল তাঁহার মর্মরমূর্তি আজ ভাঙ্গিয়া ফেলিল একদঙ্গল পিতৃপরিচয়হীন রাজনৈতিক উন্মাদ !

সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস, অর্থনৈতিক সন্ত্রাস, রাজনীতিবাজদিগের সন্ত্রাস ছাড়া ভারতবর্ষের রাজনৈতিক দলদিগের আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নাই। বিভেদ আর ভাঙ্গনের রাজনীতি যে বাতাবরন তৈয়ার করিতেছে তাহা মহাকাল ক্ষমা করিবেন না। খুঁচাইয়া খুঁচাইয়া মানুষের ভিতরের জান্তব শক্তিকে জাগ্রত করিবার এক ধ্বংসাত্মক খেলায় মাতিয়া উঠিয়াছে সকল রাজনীতির ধান্দাবাজগণ। দুইবেলা গতর খাটাইয়া, মস্তিষ্ক ঘামাইয়া যে বৃহত্তর মানবগোষ্ঠী সংসার প্রতিপালন করিতেছে স্বাতিশয় আনন্দে উহাদিগের উপর বিষাক্ত ছোবল হানিতেছে একোন অন্ধকারের রাজনীতি? তাহা হইলে জঙ্গি গোষ্ঠী আর মূল স্রোতের সংসদীয় রাজনৈতিক দল দিগের কি তফাৎ রহিল ?

তাঁহার আবক্ষ মূর্তি হইতে মস্তিষ্ক উৎপাটন করিয়া কী এমন বিরত্ব প্রকাশ করিলেন, হে রাজনীতির ধ্বজাধারী উজবুকের দল? এই অসভ্য আক্রমণ বাঙ্গালী মানিয়া লইবে কি?

সাম্রাজ্যভোগী (বাদী নয়) সুপারস্ট্রাকচার আজকের রাজনৈতিক দল এক ভারসাম্যহীন আনসোস্যাল স্ট্রাকচার সৃষ্টি করিতেছে। কিন্তু জানিয়া থাকিবেন, মানুষকে মানুষের সাথে দ্বৈরথে নামাইয়া কিছু দিনের নিমিত্ত ভোগ করা যায়,  চিরদিনের জন্য নহে। মানুষের ঐতিহাসিক নিদর্শন তাহা বলে না।

আক্রমণাত্বক যুদ্ধ, রাজনৈতিক অপরাধ, জাতপাতগত ভ্রষ্টনীতি, মানুষকে নিয়ে মারণখেলায় রত রাজনৈতিক দলসমষ্টি বিদ্যাসাগর মহাশয়কেও ছোবল মারিতে কুন্ঠিত হইল না, ইহা কোনো শুভচেতনাসম্পন্ন বাঙ্গালী মানিয়া লইলে বুঝিব বাঙ্গালীর আর মেরুদণ্ড বলিয়া কিছু নাই। আশাকরি, বাঙ্গালী রুখিয়া দিবে এমন কলঙ্কিত রাজনীতিকে। কেননা, মানুষকে মারিয়া ফেলা যায়, মানবতাকে পরাজিত করা যায়না।