মাদার-যুব’র দিনহাটায় পাল্লা দিয়ে উড়ছে ঘাস আর পদ্মফুলের পাতাকা

সুমিতেশ ঘোষ, দিনহাটাঃ বসন্তের পাতা ঝড়ে পড়ার পর্ব শেষ হয়েছে। এখন গাছে গাছে নতুন পাতা গ্রামকে আরও সবুজ করে তুলেছে। বিঘার পর বিঘা জমিতে বোরো ধান। যেন দিগন্ত জুড়ে সবুজ কারপেট। প্রকৃতির ওই সৌন্দর্যকে আরও রাঙিয়ে তুলেছে লোকসভা নির্বাচন। রাস্তা জুড়ে পতপত করে উড়ছে রঙবেরঙের পতাকা। ঘাস ফুলের সাথে যেন পাল্লা দিচ্ছে পদ্মফুল। তেমনি কোথাও কোথাও উঁকি মারছে লাল রঙ।

Top News

এরই মাঝে দিলওয়ার মিয়াঁ বোরো ধানের জমিতে সেচের কাজে ব্যস্ত। গাড়ি থামিয়ে কাছে পৌঁছে নানা কথার মাঝে ছুঁড়ে দিলাম চাচা- কয় দিন বাদে ভোট। হাওয়া কেমন বোঝেন?

“তোমরা গিলা টাউনের মানসি। হামার গেরামের রাজনীতি বুঝির না পাইবেন।”

হ্যা, দিনহাটার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের গ্রাম গুলোতে না গেলে সেখানকার বর্তমান রাজনৈতিক আবহাওয়া বুঝে ওঠা কিছুটা মুশকিলই ছিল হয়ত। নয়ারহাট পেরিয়ে বামনহাটের রাস্তায়। চা খাওয়ার ছলে রাজনীতির আবহ বোঝার চেষ্টা। আবার গ্রামের মাঝে রাস্তার পাশে একটা গালামালের দোকানকে ঘিরে জমে ওঠা আড্ডাতেও যোগদান।

সত্যি বলতে গ্রাম গুলো যেন আড়াআড়ি ভাবে ভাগ হয়ে রয়েছে। একদিকে ঘাস ফুল তো অন্য দিকে পদ্মফুল। কোন লুকোছাপা নয়, পষ্টাপষ্টি ভাবে। কোথাও কোথাও তো শুধু রাজনীতির রঙের কারনে প্রতিবেশীদের মধ্যে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ। না এটা শুধু এই লোকসভা নির্বাচন বলে নয়। রাজনৈতিক এই রেষারেষি সেই মাদার-যুব থেকে। পঞ্চায়েত নির্বাচন তখন। তৃণমূলের দুই গোষ্ঠী মাদার ও যুব। মাদার প্রতীক পেয়েছে তো যুব নির্দল হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছে। গুলি-বোমা-সংঘর্ষ কি উত্তাল পরিস্থিতি গোটা দিনহাটা জুড়ে। সেই থেকে শুরু। তারপর মাঝে কিছু দিন ধরে রাজনৈতিক সংঘর্ষ বন্ধ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু মানুষে মানুষে সম্পর্কের তিক্ততা যেন দূর হয় নি। তার মধ্যেই সমস্যা মিটিয়ে রাগ ক্ষোভ দূর করে দলে ফেরানোর চেষ্টায় ময়দানে নেমে পড়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা। অনেকে রাজী হলেও কেউ কেউ এখনও গো ধরে বসে রয়েছেন।

পোয়াতুর কুঠি সাবেক ছিটমহলে ঢোকার আগে ছোট্ট একটি গঞ্জের মত। সেখানেই এক চায়ের দোকানে বসে ছিলেন আইনুল হক। এক সময় যুব করতেন। এখন আর রাজনীতিতে যেতে চান না। বললেন, “আমরা তো তৃণমূল কংগ্রেসই করেছি। কিন্তু পঞ্চায়েত নির্বাচনে দুর্নীতি হচ্ছিল বলেই প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। সেই থেকে যুব করলাম। এখন বিজেপির দিকে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই বসে রয়েছি। তবে বহু মানুষ বিজেপিতে গিয়েছে। ঘেসারত দিতে হবে।”

অনেকটা ঘোরাঘুরির পর হাজির হয়েছিলাম দিনহাটা ২ নম্বর ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি তথা জেলা পরিষদের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ মীর হুমায়ূন কবীরের বাড়িতে। তখন বাইরে প্রচুর তৃণমূল কর্মীর ভিড়। দলের সুসংগঠক সকলের কাছে হিমুদা বলে পরিচিত। বাড়ির বাইরে অফিস ঘরে কর্মীদের ডেকে বিভিন্ন এলাকার খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন। এখনও যারা সঙ্গে আসেন নি। তাঁদের নাম তালিকা ভুক্ত করছিলেন।

কথা প্রসঙ্গে জানালাম, বামনহাট, চৌধুরীহাট, নাজিরহাট ১ ও ২, বাসন্তীরহাট সহ বেশ কিছু এলাকায় তো বিজেপি ভালো সংগঠন করেছে দেখলাম। আপনাদের সাথে সমানে সমানে পাল্লা দিচ্ছে। এটা কি সেই মাদার-যুবর জের? উনি যুক্তি দিয়ে বোঝালেন দিনহাটা ২ নম্বর ব্লকের ১২ টি গ্রাম পঞ্চায়েত তাঁদের দখলে। পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদে বিরোধী বলতে কেউ নেই। গ্রামের মানুষ উন্নয়ন চান। আর পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই সেই উন্নয়ন সম্ভব। তাই কেউ বিজেপির ফাঁদে পা দেবেন না। তাঁর আরও যুক্তি, দিনহাটা ২ নম্বর ব্লকে ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে। এদের কেউ আর যাই হোক বিজেপিতে ভোট দেবে না। আর সংখ্যা গুরুদের মধ্যেও সকলে দেখছে বিজেপির যিনি প্রার্থী হয়েছেন, তিনি তৃণমূলে থেকে কি সন্ত্রাস তৈরি করেছিলেন। তখন তাঁর সন্ত্রাসের জন্য এই এলাকার মানুষ তৃণমূল ছাড়তে চেয়েছিলেন। ওকে বের করে দেওয়াতে সকলে শান্তি পেয়েছেন। আর কেউ ওকে ভোট দিয়ে এলাকায় সন্ত্রাস ফিরিয়ে আনার পথে যাবেন না।

কিন্তু বিজেপির দাবী দিনহাটা বিধানসভা কেন্দ্র উদয়ন গুহ যেখান থেকে বিধায়ক হয়েছেন, সেখানে এবার প্রচুর ভোটে লিড নেবে তারা? মীর হুমায়ূন কবীরের উত্তর, “সেই স্বপ্ন নিয়ে থাক। সমস্ত বিধানসভার কথা বলতে পারব না। কারণ এর মধ্যে শহরও রয়েছে। তবে আমাদের এই ব্লক থেকে ৬০ হাজার ভোটে পরেশ চন্দ্র অধিকারীকে লিড দেব। আপনি লিখে রাখুন। ২৩ মে মিলিয়ে নেবেন।”

ফিরতে ফিরতেই মোবাইলে বিজেপির জলপাইগুড়ি জেলা পর্যবেক্ষক দীপ্তিমান সেনগুপ্তের সাথে কথা হচ্ছিল। দীপ্তিমান দিনহাটার বাসিন্দা। ছিটমহল আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ফলে আজও তাঁর দিনহাটার সীমান্ত গ্রাম গুলোর সাথে যোগাযোগ রয়েছে। তৃণমূলের লিড নেওয়ার দাবি শুনে তিনি বললেন, “তৃণমূল নেতারা এখন বাড়িতে বসেই রাজনীতি করেন। এলাকার খবর রাখেন না। পঞ্চায়েতে পুলিশ আর দুষ্কৃতী লাগিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছে। এবার সেটা হবে না। মানুষ ভোট দেবে, আর তৃণমূল বুদবুদের মত উড়ে যাবে।”

দিলওয়ার মিয়াঁর কথা মনে হচ্ছিল। শহরে বেশীর ভাগ মানুষ যে যাকেই সমর্থন করুন কেন, সেটা মনে মনে। তার জন্য প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কে কোন চির ধরে না। কে কোন দল করছেন, উপর থেকে খুব একটা বোঝারও উপায় নেই। কিন্তু দিনহাটার ওই গ্রাম গুলো এখন প্রকাশ্যে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কোন লুকোচুরির গল্প নেই। কে সাদা? আর কে কালো। তা যেমন পরিষ্কার। তেমনি কারণটাও স্পষ্ট।