নলেনগুড় তৈরির কর্মযজ্ঞে মেতেছে মুর্শিদাবাদের পীড়তলা গ্রামের বাসিন্দারা

সৌমিত্র দাস, মুর্শিদাবাদ: ভোরের আলো ফুটতেই ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায় ওদের। ঘুম থেকে উঠেই সোজা চলে যান গ্রামের খেজুর বাগানে। ঘন কুয়াশা ও কনকনে ঠাণ্ডায় যখন জুবুথুবু অবস্থা তার মধ্যেই সটান খেজুর গাছে উঠে পরেন ওরা। শুরু হয় রসে টইটম্বুর হাঁড়ি নামানোর কাজ। তারপর সংগৃহীত সেই রস বাড়িতে এনে জ্বাল দেওয়ার পালা শুরু হয়। সংগৃহীত রস জ্বাল করে তৈরি হয় বাঙালির কাঙ্খিত খেজুরের গুড় বা নলেন গুড়। মুর্শিদাবাদের লালবাগ থানার পীড়তলা গ্রামের রতন, রাজকুমার বা মদনরা এখন এই গুড় তৈরিতে ব্যস্ত। ফি বছর ঠান্ডা নামলেই নাকি আটপৌরে এই গ্রামটির মানুষ ব্যস্ত হয়ে পরে গুড় তৈরির এই কর্মযজ্ঞে।

Top News

 শীতের সময় এই গ্রামে গেলে দেখা যাবে সকাল হতে না হতেই গ্রামের পুরুষ মহিলারা তাদের বাড়ির উঠোনে বিশাল বিশাল আখায়(মাটি দিয়ে তৈরি এক ধরণের চুলা বা উনুন) খেজুর রস জ্বাল দিতে ব্যস্ত। সেইসব বাড়ির কাছে যেতেই নাকে ভেসে আসবে মিষ্টি রসের পাগল করা সুবাস। পরিবারশুদ্ধ লোক সবাই মিলে মাটির উনুনে বিশাল কড়াই বসিয়ে রস গরম করেন। শীতের সময় নলেন গুড়ের কল্যানে বাড়তি কিছু রোজগার আসে এই পরিবার গুলির ঘরে।

পীড়তলা গ্রামের অভিজ্ঞ কৃষক রতন সরকার জানান, “আমি এই বছর সবজি চাষের পাশাপাশি ৫০ টার মতো খেজুর গাছ থেকে মিষ্টি রস সংগ্রহ করছি এবং তা থেকে প্রতিদিন গুড় তৈরি করছি।এতে আমার সংসারে বাড়তি কিছু অর্থ যুক্ত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ভোর চারটা থেকে বেলা বারোটা পর্যন্ত আমরা এই কাজে নিযুক্ত থাকি।তবে গুড় তৈরি হয়ে গেলে বিক্রির জন্য আমাদের চিন্তা করতে হয় না।ঝোলা ও চাকি উভয় প্রকার গুড়ই রঘুনাথগঞ্জ বাজেরের বিক্রেতারা এসে কিনে নিয়ে যায়।কিন্তু আমাদের একটাই সমস্যা,ওই বিক্রেতারা অত্যন্ত কম দামে আমাদের কাছ থেকে গুড় কিনে নিয়ে যায়।যা মাঝে-মাঝে কেজি প্রতি চল্লিশ বিয়াল্লিশেও নেমে যায়।” গ্রামের অপর এক কৃষক মদন মন্ডল বলেন, “প্রথমে গাছটি ছিলি আমরা। দিন সাতেক পড়ে আবার চাছ দিতে হয় ধাপি কাটতে হয়। এরপর তিন চারদিন পর হাঁড়ি লাগাতে হয়। হাঁড়িতে রস পড়ে। ভোর বেলায় সেই রস নামিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এরপর জ্বাল করতে হয়। তারপর এই গুড় তৈরি হয়। আমদের বাড়ি থেকেই এই গুড় বিক্রি হয়ে যায়। ৪৫-৬০ টাকা দরে এই গুড় বিক্রি হয়।” যাই হোক রতন, রাজকুমার বা মদনরা কিন্তু সারা বছর হাপিত্যেশ করে বসে থাকে এই নলেন গুড়ের দিকেই। কারণ শীতের মরশুমে এই গুড় বিক্রি করে কিছু বাড়তি পয়সার মুখ দেখেন তারা। অভাবের সংসারে তা কিছুটা সময়ের জন্য সচ্ছলতার আলো নিয়ে আসে।