‘আগে রাম পরে বাম’ ভাবলে পাপ করছেন, অন্যায় করছেন

লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক বাসব রায়: 

খুব পরিষ্কারভাবে এবং স্পষ্ট করে বলার সময় এসেছে যে আপনারা যাঁরা বলছেন ‘আগে রাম পরে বাম’ কিংবা ‘একুশে ওরা ছাব্বিশে আমরা’, পাপ করছেন। ভুল নয়, অন্যায় নয়, সরাসরি পাপ করছেন। অপরাধ করছেনও বলা যায় একে। এবং হ্যাঁ, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হল একটা সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তিকে সরকার থেকে হটানো। যে যেভাবে সেই কাজে পদক্ষেপ করবেন, সেটাই প্রকৃত মানবতা, প্রকৃত দেশপ্রেম। যে কোনো স্তরে বিজেপি বিরোধিতাই এখন পবিত্র কাজ।

Top News

বিশেষ করে বাঙালিরা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন। বাঙালির প্রায় সব গিয়েও যা পড়ে আছে তা হল বাঙালিয়ানা। যে বাঙালিয়ানা রোববার দুপুরে গোল করে কাটা আলুর সঙ্গে পাঁঠার মাংসের ঝোল, পঁচিশে বৈশাখে রবীন্দ্রগানের আসর, তেইশ জানুয়ারিতে প্রভাতফেরি, ছাব্বিশ জানুয়ারিতে স্কুল-ক্লাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন। এবং যে বাঙালিয়ানা শিকড় প্রোথিত ভারতচন্দ্র থেকে।

এবং কোনো সন্দেহ নেই এই বাঙালিয়ানার মূলে আঘাত করছে বিজেপি। দোসর সংঘ পরিবার। বিদ্যাসাগর কলেজের বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রেক্ষিতে এসব বলছি না। যারা ভেঙেছে, হয়তো জানতই না, ওটা কার মূর্তি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জ্যাঠামশাই ভাবতে পারে আবার বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাবাও ভাবতে পারে, কিংবা হয়তো জ্যোতি বসুর মূর্তি ভেবেই ভেঙেছে।

কিন্তু যে আক্রোশে ওই বিখ্যাত রোড শো চলছিল, অবাঙালি মানুষে ভরপুর রোড শো, কলকাতার গর্ব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে মিছিলের লোকজন ঢুকতে চাইছিল, কলাবাগান বস্তির দিকে যেভাবে মুসলমান-বিরোধী গালিগালাজ চলছিল, একটা কলেজে ঢুকে যেভাবে মারধোর-মূর্তি-আসবাবপত্র ভাঙা হয়েছে তাতে পরিষ্কার এটা বাঙালির সংস্কৃতি নয়।

বাঙালির বাঙালিত্ব বাঁচাতেই বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাস্ত করা দরকার। যাঁরা ভাবছেন, তৃণমূলের অত্যাচার শেষ হবে বিজেপিকে জয়ী করলে, সরাসরি বলা ভালো, আপনারা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। মমতা অনেকটাই চেনা শত্রু। বামপন্থী সরকার-বিরোধী আন্দোলনে উঠে এসেছেন। তাঁর ভণ্ডামি, স্লোগান, চিৎকার, প্রতিবাদ এবং এমনকি সদর্থক কাজেও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালিয়ানা। তাঁকে আপনি অনুমান করতে পারবেন, কিন্তু এই ফ্যাসিস্ট শক্তিকে একবার জায়গা দিলে নিজের সর্বনাশও আটকাতে পারবেন না।

সুশিক্ষা, উদারতা, গণতান্ত্রিকতা, সহিষ্ণুতা, গ্রহণশীলতা, বিদ্যা এই সবকিছুর বিরোধী একটা দল বিজেপি। যাদের প্রচারে ভাবতে বাধ্য হয়েছেন যে আপনি হিন্দু না মুসলমান, যাদের প্রচারে এই সেদিন পাকিস্তান আপনার শত্রু হয়েছে, প্রতিবেশী যে কোনো মুসলমান আপনার শত্রু। এবং এখান থেকে ঘুরে দাঁড়ান।

পাঁচ বছর সরকার কী করেছে বা কী করেনি, সেসব হিসেব আজ বাদ দিন। সুশিক্ষা, উদারতা, গণতান্ত্রিকতা, সহিষ্ণুতা, গ্রহণশীলতা, বিদ্যা এবং সর্বোপরি বাঙালি-বিরোধী একটা দলকে পরাস্ত করুন। উগ্র হিন্দুত্বকে পরাস্ত করুন উদার হিন্দুবোধ দিয়ে, অসহিষ্ণুতাকে পরাস্ত করুন, গ্রহণশীলতা দিয়ে, কুসংস্কারকে পরাস্ত করুন জ্ঞান-বিদ্যা দিয়ে, ঘৃণাকে জয় করুন সুশিক্ষা দিয়ে, উদারতা দিয়ে জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে আপন করুন।

মশলা হিন্দি ফিল্মের সবচেয়ে দুর্বল ও ভাঁড় জাতীয় চরিত্রকে সবসময় বাঙালি সাজানো হয়। মনে রাখুন ‘জব উই মেট’-এর ওই বাঙালি চালকের দৃশ্যটা। ঘৃণা করুন,‘বাঙালিরা তো চানাওয়ালা’,‘উইপোকা’,‘ঘুসপেটিয়া’ বলা মুখগুলোকে। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা ওদের কাছে সামান্য ব্যাপার। যার জন্যই প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন,‘পঞ্চধাতু দিয়ে বানিয়ে দেব।’ যেন কোনো মূর্তি অনবধানতাবশত হাত থেকে পড়ে টুকরো হয়েছে!

যাঁরা সংশয়ে ছিলেন এতদিন যে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো বিজেপিও একটা দল, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙায় অন্তত নিশ্চিত হয়েছেন যে না, এই দলটা আপাদমস্তক বাঙালি-বিরোধী। এবং সময় এসেছে বাংলা তথা গোটা ভারতেই এই দলটার শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়ার।

আজ জার্মানিতে কোনো বৃদ্ধ যদি হিটলারের অপরাধ নিয়ে সমালোচনা করেন, কিশোর-যুবকরা বলে, ‘তোমরা তখন কী করছিলে ? বিজেপিকে ডেকে আনলে পরবর্তী প্রজন্মও আপনাকে সেই একই প্রশ্ন করবে যে তখন তুমি কী করছিলে। এগিয়ে চলুন, ভবিষ্যৎ আপনাকেই গড়তে হবে। মনে রাখবেন, পাপের পথ বড় মসৃণ।