প্রসঙ্গ এক্সিট পোল: মানুষকে পড়া যায় না

কল্যাণময় দাস: সদ্য সমাপ্ত সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন’২০১৯। একদম নিরন্ন মানুষের গোষ্ঠী থেকে শুরু করে বিভিন্ন উচ্চস্তরীয় মহলে শুরু হয়ে গেছে সম্ভাব্য শাসকের আলোচনা। হুঁ, ঠিক ধরেছেন, এক্সিট পোল।

Top News

কিন্তু আমি দুটো তিনটে নিতান্তই সম্ভাবনা আর একই সঙ্গে অতীতের এক্সিট পোল বিষয়ে দুএকটা কথা বলার প্রয়াস পাচ্ছি। এই আলোচনায় প্রবেশ করার আগে কয়েকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে আমাদের। প্রথমতঃ, নানাদিক থেকে এক বিপুল বিভক্ত আমাদের এই দেশ। দ্বিতীয়তঃ, এ দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ এখনো স্কুলের মুখ দেখেনি। তৃতীয়তঃ, অশিক্ষা আর কুসংস্কারে লেপ্টে থাকা এই দেশের মনুষ্য সমাজ। চতুর্থতঃ, দিনগুজরানোর জন্য এবং আরেকদিকে বিপুল অর্থলালসা-জালে যথাক্রমে 70% এবং 30% মানুষের মস্তিষ্ক ঘূর্ণমান। পঞ্চমতঃ, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বপ্ন-ফেরি-করা বক্তৃতায় এবং নানারকম সেন্টিমেন্টে সুরসুরি, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মানুষের মন পড়া যায় না।

ভারতবর্ষে এক্সিট পোল বরাবর “ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ এলায়েন্স”কে দ্বিতীয় স্হানে এবং “ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স”কে প্রথম স্হানে রেখেই হিসেব কষে এসেছে। এটা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য ও পরিসংখ্যান তত্ত্বের হিসেবেও সত্য। আর এক্সিট পোলের ইতিহাসটাই ইউপিএকে দ্বিতীয় এবং এনডিএকে প্রথম রাখার ইতিহাস। আমরা যদি অতিতের তিনটে সাধারণ নির্বাচন বা ১৫ বছরের মধ্যে ঘটে যাওয়া তিনটে নির্বাচনের এক্সিটপোল এবং ব্যালট পেপার বা ইভিএম খোলার পরে প্রকাশিত ফল নিয়ে আলোচনা করি তাহলে বোঝা যেতে পারে এক্সিট পোল আসলে কি বস্তু। গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক, ইউবিএস বলছে, এক্সিট পোল 4.3% বেশি নম্বর দিয়ে এনডিএকে এগিয়ে প্রথম স্হানে রাখে আর ইউপিএকে দ্বিতীয় স্হানে রাখে 8.9% কমিয়ে। এটা গত তিনটি সাধারণ নির্বাচনের পরিসংখ্যান-পরিপ্রেক্ষিত।

আমরা একবার দেখে নিই যে, কেন একথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। ফলাফল যাইই হোক, এক্সিট পোলের হিসেব একটা ভ্রান্তির ইতিহাস। ২০০৪, যতগুলো এক্সপার্ট টিম এক্সিট পোলের হিসেব দিয়েছিল – তার গড় সম্ভাব্য জয়ের তালিকায় এনডিএর ছিল ২৫২টি আসন, আর ১৮৬ আসন ছিল ইউপিএর। কিন্তু এক্সিট পোল যাই হোক না কেন ইউপিএ সেবার সরকার গঠন করেছিল ২১৯ টা আসন দখল করে আর বাজপেয়ির নেতৃত্বে এনডিএ ১৮৭ টা আসন জিতে বসেছিল লোকসভার বিরোধী আসনে। সেসময়ের এক্সিট পোল পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, এক্সিট পোল এনডিএকে ২৫.৮% বাড়তি এগিয়ে রেখেছিল যেখানে ১৭.৭% কমিয়ে পিছিয়ে রেখেছিল এনডিএকে। ফল হয়েছিল ৯০ ডিগ্রি উল্টো।

২০০৯, যখন ক্ষমতাসীন এনডিএ, তখন এক্সিট পোল ধারণা করলো বিপুল আসন কমবে এনডিএর, কিন্তু বিপুল আসনে জয়ী হলো এনডিএ সেবারও। সেবারের এক্সিট পোল এনডিএকে দিয়েছিল ১৯৬টা আসন, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল মিলিজুলি সরকার ২৬২টা আসন সংগ্রহ করে সরকার গড়লো ইউপিএ। শতাংসের হিসেবেও বিরাট ফারাক হয়েছিল এক্সিট পোলের – ৩৩.৬% এবং অন্যদিকে, যাদের ভাবা হয়েছিল এক্সিট পোলের হিসেবে সরকার গঠন করবে তারা পেল ১৫৯ টা আসন। এক্সিট পোল তাদের দিয়ে রেখেছিল ১৪.৯ বেশি।

যখন সারা দেশ মোদী-হাওয়ায় উথালপাথাল, যদিও সেবার এক্সিট পোল ঠিকই ধারণা করেছিল, তবুও সেটাও ছিল সম্পূর্ণ এক ভ্রান্ত তালিকা। এক্সিট পোল এনডিএকে দিয়েছিল ২৭৪টা আসন, কিন্তু এনডিএ পেল ৩৩৬টা আসন। প্রায় ২২.৭% অঙ্কের হেরফের ছিল সেখানেও। ৬০-৬২টা আসনের হেরফের কম নয়। এই সময়কার এক্সিট পোলের ভুল পরিসংখ্যানের নজির, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, নজর এড়ায়নি এবং একটা হাস্যকর উদাহরণও হয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে তার যথেষ্ট শক্তিশালী উদাহরণ আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্ফের জয়। কর্ণাটক রাজ্যের নির্বাচনে ভোটনায়করা কংগ্রেসের ফের শাসনে ফিরে আসার কথা বলেছিল কিন্তু প্রকৃতবিচারে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সিংহাসন দখল করল।

আন্তর্জাতিক ভোটগণকরা ২০১৬ সালে ব্রেক্সিটকে নিয়ে কত কান্ডই না করল ! ইউএস প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে- যেখানে গণনার আগে বলা হচ্ছিল, হিলারি ক্লিন্টনের জয়ের কথা। আর ২০১৯ এর এক্সিট পোল তো ভীষণ অস্বস্তিকর ছিল গত রবিবারের আগে পর্যন্ত। সেফোলজিস্টরা অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল ইলেকশন, যা গত রবিবার প্রকাশ পেল, যেখানে তাঁরা এক্সিট পোলে বললেন, অস্ট্রেলিয়ান লেবর পার্টির জয়ের কথা – সেখানে অস্ট্রেলিয়ান লিবারেল পার্টির স্কট মরিশন সবাইকে তাজ্জব করে দিয়ে সবাইকে ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়ে সিংহাসনে বসলেন।একটা উন্নত, শিক্ষিত দেশের ভোটজয়ের জনসমীক্ষার ফল যদি একদম বিপরীত কোটিতে গিয়ে বিপর্যস্ত হয়, তবে একটা উন্নতিকামী, অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, রোগদীর্ণ, খাদ্যবস্ত্রবাসস্হানহীন, অসংস্কৃত, লোভী, ধান্দাবাজ, পরশ্রীকাতর দেশে কি করে এক্সিট পোলের মত একটা অবৈজ্ঞানিক প্রথাকে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে “সম্ভাব্য জয়ী বা সম্ভাব্য পরাজিত” এই শব্দবন্ধ দিয়ে?

কেননা, মানুষকে পড়া যায় না।