বাংলা নববর্ষ কেন পালন করি, কে এর প্রতিষ্ঠাতা তা জেনে নিন!

ওয়েব ডেস্ক, ১৫ এপ্রিলঃ বৈশাখ হল বাংলা বছরের প্রথম মাস, আর পয়লা বৈশাখ হল বছরের প্রথম দিন। এই দিনটিতে আমরা ‘নববর্ষ’ পালন করি।’নববর্ষ’ বাঙ্গালিদের একটি সার্বজনীন উৎসব। নববর্ষের দিন কি হয় বলতো? প্রথমেই বলতে হয় নতুন জামার কথা। এছাড়া নববর্ষের দিনে বাড়িতে ভালো ভালো খাওয়া দাওয়াও হয়। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে।

বড়রা ছোটদের আশীর্বাদ করেন। নানারকমের গান-বাজনার অনুষ্ঠান হয়। যাঁরা ব্যবসা করেন, তাঁরা অনেকেই এইদিনে ‘হালখাতা’ করেন, অর্থাৎ নতুন বছরের ব্যবসার জন্য নতুন একটি হিসাবের খাতা ব্যবহার করা শুরু করেন।এইদিন সন্ধ্যাবেলা পরিচিত দোকান গুলিতে গেলেই হাতে পাওয়া যায় মিষ্টির বাক্স আর নতুন ক্যালেন্ডার। সবাই একে অপরকে ‘শুভ নববর্ষ’ বলে সম্বোধন করে।

বাড়িতে কেনা হয় নতুন পঞ্জিকা। পঞ্জিকা কি জানতো? পঞ্জিকা হল আসলে বইএর আকারে একটা ক্যালেন্ডার। দিন ও সময়ের হিসাব ছাড়াও এই বইতে অন্য অনেক তথ্য থাকে, যেমন, সূর্য রোজ কখন উঠবে আর অস্ত যাবে, কবে কোন উতসব হবে, সব লেখা থাকে পঞ্জিকা তে।

নদীর জোয়ার-ভাঁটার সময়, পূর্নিমা আর অমাবস্যা কবে-এইসব নানারকম তথ্য ভরা থাকে পঞ্জিকাতে। বাড়িতে দিদান বা ঠাম্মাকে জিজ্ঞেস কর-ঠিক দেখতে পেয়ে যাবে একটা পুরনো বা হয়ত এই বছরেরই পঞ্জিকা। প্রত্যেক নতুন বছর তৈরি হয় একটি করে নতুন পঞ্জিকা। বলতে পার ক্যালেন্ডারের বাংলা নাম হল পঞ্জিকা।

নববর্ষ আর পঞ্জিকা নিয়ে তো কিছু কথা কথা জেনে নিলাম। কিন্তু নববর্ষ উতসব কবে থেকে শুরু হয়েছিল জান কি? আর কে-ই বা প্রথম শুরু করেন আজকের বাংলা সনের হিসাব? আজকে আমরা যে বাংলা সন মেনে চলি, তার প্রচলন করেন মুঘল বাদশাহ আকবর। আকবরের আগের মুঘল বাদশাহরা হিজরি সন মেনে চলতেন। সেই সময়ের বঙ্গদেশে বছরের হিসাব রাখা হত শকাব্দ মেনে।

আকবর

হিজরি সন চাঁদের গতি অনুসরন করে তৈরি করা হয়েছিল। বাদশাহরা এই সনের হিসাবে কর আদায় করতেন। অথচ মুশকিল হল, এই চাঁদের নিয়মে চলা সন ছিল সূর্যের নিয়মে চলা বছরের থেকে প্রায় ১১-১২ দিন ছোট। পৃথিবীর বুকে শস্য উতপাদন হয় সূর্যের গতি-প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। তাই হিজরি সন মেনে কর দিতে গিয়ে চাষীদের নাজেহাল নাকাল হতে হত। কারণ যে সময়ে হিসাব করে কর চাওয়া হত, সেই সময়ে তো ফসলই ফলত না। বাদশাহ আকবরই প্রথম বুঝতে পারেন এই অসুবিধার কথা। তাঁর নির্দেশে, আমির ফতেউল্লাহ সিরাজি নামে এক জ্যোতির্বিজ্ঞানী নতুন ভাবে বছরের হিসাব করা শুরু করেন। এই নতুন ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকার নাম হল তারিখ-এ-ইলাহি। ফসলের সময়ের কথা মাথায় রেখে তৈরি বলে এর আরেক নাম হল ‘ফসলী সন’।

৯৬৩ হিজরি সনের (১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দ)রবিউল আওয়াল মাসের পাশাপাশি পড়ল শকাব্দের বৈশাখ মাস। তারিখ-এ-ইলাহির প্রথম মাস ধরা হল বৈশাখকে। কিন্ত বছর গোনা শুরু হয়েছিল ১লা মহরম ৯৬৩ হিজরি থেকে। হিজরি পঞ্জিকা যেহেতু চাঁদের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, তাই বঙ্গাব্দের থেকে হিজরি বছর ১১-১২ দিন ছোট হয়। গত সাড়ে চারশ বছরের একটু বেশি সময়ে তাই হিজরি সন, বাংলা সনের থেকে প্রায় ১৫ বছর এগিয়ে গেছে। আবার খ্রীষ্টাব্দের থেকে বঙ্গাব্দ সবসময়ই ৫৯৩ বছর পিছিয়ে থাকে। বাদশাহ আকবরই কিন্তু আদতে শুরু করেন নববর্ষ পালন প্রথা। তিনিই প্রথম শুরু করেন নওরোজ বা বছরের প্রথম দিন পালন করার উৎসব।

আকবরের সময় মাসের প্রত্যেক দিনের একটা করে আলাদা নাম ছিল। ভাবো একবার, একত্রিশ দিনের একত্রিশটা নাম। আকবরের নাতি শাহজাহানই প্রথম দিনগুলিকে সপ্তাহে ভাগ করেন এবং পাশ্চাত্য ক্যালেন্ডারের মত রবিবারকে সপ্তাহের প্রথম দিন ঘোষণা করেন। বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের নামে রাখা হয় দিন গুলির নাম।

খ্রীষ্টাব্দের মত বঙ্গাব্দেও ৩৬৫ দিনে বছর হয়। কিন্তু পৃথিবী তো সূর্যের চারিদিকে ঘুরতে ৩৬৫ দিনের থেকে একটু বেশি সময় নেয়। ঐ বেশি সময়টুকু যোগ করে চার বছর বাদে একবার করে লিপ ইয়ার হয়। সেই বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ২৯ দিন হয়, জানোতো?

প্রথমদিকে বাংলা পঞ্জিকা ঐ বেশি সময়ের হিসাব রাখত না। ১৯৬৬ সালে বাংলাদেশের বাংলা অ্যাকাডেমির তরফ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা হয়। এই মতে, বৈশাখ থেকে ভাদ্র, প্রতি মাস হয় ৩১ দিনে। আশ্বিন থেকে চৈত্র, প্রতি মাস হয় ৩০ দিনে। চার বছর পরে পরে চৈত্র মাসে ৩১ দিন হয়।

বাংলা ক্যালেন্ডারের একটি পাতা

বলত, এই বছরটা বাংলায় কত সাল ? ঠিক বলেছ, ১৪১৬সাল। তোমরা যারা এত সব সংখ্যা দেখে একটু আধটু যোগ-বিয়োগ করা শুরু করে দিয়েছ, তারা নিশ্চয় ভাবছ, হিসাবমত তো বঙ্গাব্দের এত বয়স হওয়ার কথা নয়! ঠিকই ধরেছ, আসলে বঙ্গাব্দ গোনা শুরু হয়েছিল ১ থেকে নয়, ৯৬৩ থেকেই! সেইজন্যই তো সাড়ে চারশ বছরের মধ্যেই বঙ্গাব্দ এত্তটা বড় হয়ে গেল। আহা…তুমিও যদি বঙ্গাব্দের মত একটু বড় হয়েই জন্মাতে তাহলে কেমন হত?

হিজরিঃ সারা পৃথিবীর বহু ইসলাম ধর্ম পালনকারী মানুষ এই ক্যালেন্ডার মেনে চলেন। হিজরি সন গোনা শুরু করা হয়েছে ‘হিজরা’র সময় থেকে-যে সময়ে ইসলাম ধর্মগুরু হজরত মহম্মদ মক্কা থেকে মদিনায় যাত্রা করেন। বর্তমান হিজরি সন হল ১৪৩০।

খ্রীষ্টাব্দঃ সারা পৃথিবী জুড়ে সাধারনভাবে যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হয়।এই ক্যালেন্ডারের সময় হিসাব করা হয় অন্য ডোমিনি (ANNO DOMINI) নিয়মে। যেমন, এই বছরটি হল ২০০৯ খ্রীষ্টাব্দ।

শকাব্দঃ শক পঞ্জিকা যা শুরু হয়েছিল ৭৮ খ্রীষ্টাব্দ থেকে। কেউ বলেন এই পঞ্জিকা শুরু করেছিলান কুষাণ রাজা কনিষ্ক। কেউ বা বলেন এই পঞ্জিকা শুরু হয়েছিল শক রাজা শালিবাহনের মৃত্যুর পর। শকাব্দ ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় মেনে চলা হত। শকাব্দ থেকে ৫১৫ বাদ দিলে বঙ্গাব্দ পাওয়া যায়। আর ৭৮ যোগ করলে খ্রীষ্টাব্দ পাওয়া যায়। অনেক সময়ে নতুন ডায়েরি বা ক্যালেন্ডারে একসঙ্গে হিজরি, খ্রীষ্টাব্দ, বঙ্গাব্দ, তিনরকমের বছরেরই হিসাব দেওয়া থাকে।