রাহুলের ভাষণে চটবেন মমতা, বিরোধী মহাজোটে অশনি সংকেত

               গৌতম সরকার

বিরোধী মহাজোটের কফিনে আরও একটা পেরেক পুঁতে গেলেন রাহুল গান্ধী। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হওয়ার পর এই প্রথম তিনি তৃণমূল তো বটেই, নাম উচ্চারণ করে অত‍্যন্ত কঠোর ভাষায় মমতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের সমালোচনা করলেন। মুখ‍্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে ত়াঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা যে যে অভিযোগ তুলে থাকেন, সোজাসাপ্টা শব্দে তাতে সিলমোহর দিলেন রাহুল। স্পষ্ট ভাষাতেই তিনি বললেন, পশ্চিমবঙ্গে একনায়কতন্ত্র চলছে। একজন এখানে রাজ‍্য চালান। তিনি কারও কথা শোনেন না, কাউকে বলতেও দেন না।

Top News

রাহুলের অভিযোগ, মমতা নিজে যা বোঝেন, সেই অনুযায়ী চলেন। কংগ্রেস সভাপতির বক্তব‍্যের সারসংক্ষেপ হল, বামফ্রন্ট জমানার চেয়ে তৃণমূল রাজত্বের কোন পার্থক‍্য নেই। আগের মতোই বাংলায় শাসকদলের অত‍্যাচার চলছে। উন্নয়নও তেমন কিছুই হয়নি। রাহুলের এই বক্তব‍্য রাজ‍্যবাসী শনিবার শুনলেন। এদিন মালদহের চাঁচলে তিনি এক সভায় ভাষণ দেন। এটাই রাজ‍্যে তাঁর প্রথম নির্বাচনী জনসভা। তাছাড়া কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর এদিন ছিল পশ্চিমবঙ্গে রাহুলের প্রথম সভা। ইতিমধ‍্যে বিরোধী মহাজোট গঠনে রাহুল মরিয়া প্রয়াস চালিয়েছেন। এ ব‍্যাপারে মমতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের উদ‍্যোগের সঙ্গেও সামিল হয়েছিলেন।

দিল্লি, কর্নাটকে বিরোধী মহাজোটের বিভিন্ন বৈঠকে রাহুল ও মমতাকে একসঙ্গে দেখা গিয়েছে। মমতা উদ‍্যোগী হয়ে দিল্লিতে আপ, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গড়ার জন‍্য রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। রাজ‍্য কংগ্রেস নেতারা অনূপস্থিত থাকলেও ১৯ জানুয়ারি কলকাতায় তৃণমূলের ব্রিগেড সভায় দলের হেভিওয়েট নেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গেকে পাঠিয়েছিলেন রাহুল। দেশ জুড়ে বিরোধী মহাগঠবন্ধনে তৃণমূল ও কংগ্রেস, দুই দলই থাকে বলে জোর আলোচনা ছিল।

যদিও পশ্চিমবঙ্গে রাজ‍্য নেতাদের আপত্তিতে তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট প্রচেষ্টার কোন উদ‍্যোগই নেওয়া হয়নি। বরং বামফ্রন্টের সঙ্গে আসন সমঝোতা করার চেষ্টা করেছিল কংগ্রেস। কিন্তু শেষপর্যন্ত তা ভেস্তে যায়। তাই বামফ্রন্টের মতো রাজ‍্য কংগ্রেসও পশ্চিমবঙ্গে আপন্ন লোকসভা নির্বিচনে কংগ্রেস একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ‍্যে লোকসভা ভোটে তৃণমূলের মোকাবিলা করতে হচ্ছে কংগ্রেসকে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে এসে রাহুল কী বলেন, সেদিকেই নজর ছিল শুধু কংগ্রেসের বিরোধী বা সহযোগী সব রাজনৈতিক দলের। শনিবার চা়ঁচলে রাহুলের ভাষণ কংগ্রেসের বঙ্গ ব্রিগেডকে আহ্লাদিত করবে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি যে ভাষায় মমতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়কে ব়িঁধলেন, তাতে এরপর আর দুই দলের একসঙ্গে বিরোধী মহাজোটের শরিক হওয়া সম্ভব কিনা, সেই প্রশ্ন তুলে দিল।

বাস্তবে মোদী ও মমতাকে এক বন্ধনীতে রেখে সমালোচনা করেছেন রাহুল গান্ধী। তাঁর বক্তব‍্য, কৃষকের ঋণ মুকুবের ব‍্যাপারে মোদী, জেটলি থেকে শুরু করে মমতা পর্যন্ত কিছু করেননি। মোদী যেমন মানুষের জন‍্য কিছু করেননি, তেমনই মমতা এই রাজ‍্যে কৃষক থেকে শুরু করে যুবকদের জন‍্য কিছুই করেননি। উপহাস আর কটাক্ষে ভরা তাঁর বক্তব‍্য ছিল, বাংলায় শুধু দিনভর ভাষণ চলে। রাজ‍্যে একজন আছেন, যিনি শুধু যা মনে আসে বলে যান। কারও কথা শোনেন না। মোদী সম্পর্কেও প্রায় একই মন্তব‍্য করেছেন রাহুল।

 তিনি বলেছেন, ২০১৪-তে ক্ষমতায় আসার আগে মোদী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রতি বছর ২ কোটি লোকের কর্মসংস্থান করে দেবেন। বিদেশ থেকে কালো টাকা ফিরিয়ে প্রত‍্যেক ভারতবাসীর ব‍্যাঙ্ক অ্যকাউন্টে ১৫ লক্ষ করে টাকা জমা করে দেবেন। কারও অ্যকাউন্টে ওই টাকা ঢোকেনি। বরং বিমুদ্রাকরণের ফলে অ্যকাউন্ট ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। অন‍্য দিকে, প্রতি বছর ২ কোটি কর্মসংস্থানের বদলে ২ কোটি লোক কাজ হারিয়েছেন বলে একটি জাতীয় সমীক্ষা রিপোর্টে উঠে এসেছে।

তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে রাহুল সমস্ত বিরোধীদের ঢংয়েই অত‍্যাচারের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, সিপিএম আমলে যেমন কংগ্রেস কর্মীদের উপর অত‍্যাচার করা হত, তৃণমূল জমানায় সেই এক কাজ চলছে। রোজ মার খাচ্ছেন কংগ্রেস কর্মীরা।

রাহুল গান্ধীর এই বক্তব‍্যে যে মমতা রুষ্ট হবেন, তা তো বলাই বাহুল‍্য। এরপর তিনি যে আর কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন না, তা বলেই দেওয়া যায়। বাংলার ব‍্যাপারে রাহুলের ভাষণ বরং বিজেপিকে খুশি করতে পারে। এবং বিরোধীদের এই বিভাজন লোকসভা ভোটের আগে ও পরে বিজেপির পক্ষে শুভ হতে পারে। কেননা, কংগ্রেস, তৃণমূলের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিরোধী মহাজোট গঠনের সম্ভাবনায়।